Bangla
গ্রন্থপাঠ / চতুষ্কোণ গ্যাং নিভৃতে অবগাহন
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন তার ‘মাই লাইফ’ আত্মজীবনী গ্রন্থে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ‘দ্য ফ্রেন্ডস অফ বিল’দের। বন্ধুদের অপরিসীম ভূমিকা, অনুপ্রেরনা এবং সহযোগিতা পেয়েই যে তিনি পৌঁছেছেন আমেরিকার সর্বোচ্চ ক্ষমতার সিংহাসনে সে কথা উচ্চারণ করেছেন গভীর কৃতজ্ঞতায়। আবার যশোরের সাগরদাঁড়ীতে জন্ম নেওয়া মাইকেল মধুসূদনের ফ্রান্সে অবস্থানকালীন ঋণে জর্জরিত অবস্থায় বিদ্যাসাগরের অর্থনৈতিক সহযোগিতায় বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর কথা আমাদের সকলের জানা। অপরদিকে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় মান্না দে গীত ‘কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটি শোনেননি, মনের ওপর রেখাপাত করেনি এমন বাঙালি শ্রোতা পাওয়া সত্যিই দুর্লভ। নিখিলেশ, মঈদুল, গোয়ানীস ডিসুজা, রমা রায়, সুজাতা, নিখিলেশ সান্যালদের মতো সাত বন্ধুর বন্ধুত্ব এবং পরিণাম বন্ধুত্বরই এক নস্টালজিয়া। শুধু নস্টালজিয়া নয় বরং শ্যামলপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ জীবনের কৈশোর বেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের যৌবন বেলা, পেশাগত জীবনে চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়া, ব্যস্ততা অথচ একাকী নিঃসঙ্গতার ঘেরাটোপ ডিঙ্গিয়ে পরিণত বেলায় পুনঃবন্ধনের মোহনায় একত্রিত হওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা নিয়ে কবি রিদওয়ান, বিসিএস ক্যাডার প্রেমিক পুরুষ সামিদ, নিষ্পেষিত কর্পোরেট তানভীর আর ভুবনজয়ী অথচ গৃহকোণে আবদ্ধ হয়ে পড়া ব্যক্তিত্ব সম্পর্ণা সুনিয়া বন্ধু চতুষ্ঠয়ের জীবনগাঁথা নিয়ে ঝরনার উচ্ছলতার মতো, নদীর বহমানতার কাব্যের মতো, সমুদ্রে অবগাহনের বাধ্যবাধকতা-পরিণাম-নিয়তির মতো উপন্যাস ‘চতুষ্কোণ গ্যাং’ লিখেছেন কবি ও ঔপন্যাসিক সালাম খোকন। খাদিজাতুল কোবরার পরিচ্ছন্ন জটহীন জটখোলার প্রচ্ছদে, শিল্পৈষী প্রকাশনা থেকে ২০২৬ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পাঠক বান্ধব প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়েছে কবি ও ঔপন্যাসিক সালাম খোকনের অভিজ্ঞতালব্ধ উপন্যাস ‘চতুষ্কোণ গ্যাং’।চতুষ্কোণ না বরং ত্রিকোণ হয় তখনই যখন তা ত্রিভুজ তথা তিন বাহুর সংমিশ্রণ। চতুষ্কোণ হলো সেভাবেই যখন তা চতুর্ভুজ তথা চার বাহুর সংমিশ্রণ। এই চার বাহুরূপ চার চরিত্র গম্ভীর রিদওয়ান, চঞ্চল, সানিদ, লাজুক তানভীর আর দীপ্তিময়ী সুনিয়ার প্রথম সংমিশ্রণ ঘটে শ্যামলপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়ে বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসবে নাটক একটি স্বপ্নের গল্পে অভিনয় করার মধ্যে দিয়ে। নাটকের সার্থকতা তাদেরকে উপহার দেয় বন্ধুত্বের গভীরতা। আচরণে, উৎকর্ষতায়, বেড়ে ওঠায় এই বন্ধুত্বই যখন চলমান সিঁড়ি তখন তারা নিশ্চিত হয় অভিন্ন হৃদয়ের। ভিন্ন আবহ থেকে আসা চারজনের জীবনবোধ চার কোণ। অথচ বন্ধুত্বের বন্ধনে রচিত হয়েছে যে ক্ষেত্র সেটিও তো অনেকটা জ্যামিতিতে চারটে বাহু মিলে তৈরি ক্ষেত্রর মতন। ফলে মানুষ চারজন, জীবনের আবহে চার কোণ, অভিন্ন ক্ষেত্রে চারজনের অভিন্ন বন্ধন। ফলে কলেজের অধ্যয়নে, সংযোগের মোবাইল কমিউনিকেশনে, সৃজনশীল শিল্প নির্মাণে মান-অভিমান-অনুভূতি আদান প্রদানে তারাই হয়ে গেলো চতুষ্কোণ। তারুণ্যের উচ্ছলতায় চতুষ্কোণ গ্যাং।চতুষ্কোণ গ্যাংয়ের পথ চলা কলেজ জীবনে সরলরেখায় চললেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে চারজনের ভর্তি হওয়াটা সহজ সরল ছিলো না। রিদওয়ান, সুনিয়া প্রথম তালিকায় চান্স পেলেও তানভীর-সামিদকে আসতে হয়েছে অপেক্ষামাণ তালিকা থেকে। বন্ধুত্বের সীমানা ছুঁয়ে সুনিয়া ও রিদওয়ানের মধ্যে যে সুপ্ত প্রেম তাকে খণ্ড বিখণ্ড করতে এসে পড়ে যে আরাফ সেও আসে বাঁকা পথে। অন্য বিভাগ থেকে ট্রান্সফার হয়ে। একদিকে উপন্যাসের গতিপথ মফস্বল পেরিয়ে ঢাকা, ঢাকা চষে বেড়িয়ে কাপ্তাই লেক, চট্টগ্রামের পাহাড়ী ঝরণা সমুদ্রের সীমানা পেরিয়ে মানব মনের অলি গলিতে আনাগোনা অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ছায়ার মানুষে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জীবন ও শিল্পের দোত্যনা।আরাফ-সুনিয়া-রিদওয়ানের ত্রিভুজ লড়াইয়ের পটভূমিতে জীবন সত্য নাকি শিল্প সত্য, জীবনের ছায়া কি শিল্প পড়ে নাকি শিল্পের ছায়া জীবনে পড়ে, প্রেমের জন্যে বন্ধুত্ব হারানো নাকি বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে প্রেমকে সহনশীল মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়ার বহুমাত্রিক দ্বান্দ্বিকতায় কবি ও ঔপন্যাসিক সালাম খোকনের যে আত্ম জিজ্ঞাসা, মাকড়সার জালের মতো যে অক্ষর-শব্দ-বাক্য বিন্যাস, প্রজাপতিকে আঁকড়ে না ধরে ফুল বন সৃজন করে প্রজাপতির অভয় অরণ্যের যে কৌশলী সৃজন রচনা তা এককথায় অনন্য অতুলনীয়, অনুভব ছাড়া বোঝানো যায় না। যেভাবে অব্যক্ত থেকে যায় সুনিয়া আর আরাফের ভালোবাসার মাঝে রিদওয়ানের অব্যক্ত শব্দের উচ্চারণ,তাকে ভালোবাসি বললে হয়তো সে চলে যাবে,কারণ ভালোবাসার দায় অনেক;কিন্তু না বললে সে থেকেও থাকবে না,এই না-থাকা আরও কষ্টের।বন্ধুত্ব মানে তো শুধু পাশে থাকা-তাহলে কেন সে দূরে, যখন কাছেই আছে?আমার দূরত্ব কি তার পছন্দের,নাকি আমার ভালোবাসার ভয়?ভয় না বাস্তবতা তো এরকম যে সময়কে মেনে নিতে হয়, সময়ের দাবিকে অগ্রাহ্য করার খুব বেশি নেই উপায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে চতুষ্কোণ আজ চতুর্মুখী। সামিদ সরকারি চাকরি নিয়ে সিলেটে, তানভীর কর্পোরেট চাকরি নিয়ে চট্টগ্রামে, সুনিয়া আরাফ বিয়ে করে গৃহকোণে আর রিদওয়ান এই কলমের কালি ঝরিয়ে শিল্পের রণাঙ্গনে। জীবন জীবনের মতো বয়ে যায়, চতুষ্কোণ গ্যাং পুনঃমিলিত হবে সেই অনাগতের প্রত্যাশায়।
Discussion
Please Sign In to join the discussion.