Bangla
অপরাধীদের দখলে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ৬ কিমি
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাস্টারবাড়ী থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মাত্র ৬ কিলোমিটার সড়ক এখন এক ভয়ংকর অপরাধী চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাতে বিশেষ কৌশলে সক্রিয় হয়ে ওঠে ছিনতাই ও ডাকাত চক্র। রাস্তায় আলোর সংকট, ঘন জঙ্গল, নিস্তব্ধ পরিবেশ এবং টহল পুলিশের কম উপস্থিতির কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি এখন অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে এই এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বেড়েই চলেছে। রাত যত গভীর হয়, চক্রের সদস্যরা ততই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ধারালো শাবল ও লোহার রড নিয়ে তারা মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ওপর হামলা চালায় এবং যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নেয়।অনেক সময় চালকদের আহত করে প্রাইভেটকার বা ছোট যানবাহন ছিনতাই করে গভীর শালবনের ভেতরে পালিয়ে যায়। প্রতিনিয়ত এমন ঘটনা ঘটায় মহাসড়কের এই অংশটি যাত্রীদের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে।ভুক্তভোগীরা জানান, চক্রটি ধারালো শাবল বা লোহার রড দিয়ে আচমকা যানবাহনে আঘাত করে। কোনো চালক গাড়ি থামালেই তারা হামলে পড়ে এবং মূল্যবান সামগ্রী ও টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়। অনেক সময় চালককে একের পর এক আঘাত করে আহত করা হয়।চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার রেন্ট-এ কার চালক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমরা যারা গাড়ি চালাই, তারা খুব ভয় নিয়ে এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করি। কয়েক দিন আগে রাত ২টার দিকে ন্যাশনাল পার্কের ২ নম্বর গেট এলাকায় পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা খুব জোরে আমার গাড়িতে ঢিল ছোড়ে। পরে শাবল দিয়ে আঘাত করে। আমি দ্রুত ওই এলাকা ছেড়ে চলে আসি।’নগরের তেলিপাড়া এলাকার আরেক চালক আজিজুল ইসলাম জানান, রাত ১০টার দিকে রাজেন্দ্রপুর স্টেশনের কিছুটা দূরে গাছের মোটা ডাল দিয়ে তার গাড়িতে আঘাত করা হয়। তিনি বুঝতে পেরে গাড়ি না থামিয়ে চলে আসেন। মাস্টারবাড়ী এসে দেখেন গাড়ির গ্লাস ভেঙে গেছে এবং গাড়ির বেশ ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় ২৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এই চালক।ইটাহাটা এলাকার ফরিদ মিয়া বলেন, রাত ১২টার দিকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান পার হওয়ার সময় হঠাৎ গাড়িতে বিকট শব্দ হয়। গাড়ি না থামিয়ে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তায় গিয়ে তিনি গাড়িতে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান।স্থানীয়রা তাকে জানান, ছিনতাই চক্র গাড়িতে জোরে আঘাত করে। চালক গাড়ি থামালে তারা সবকিছু লুট করে বনের ভেতরে পালিয়ে যায়। তারা মূলত প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসকে টার্গেট করে।স্থানীয় পোশাক কারখানার এক কর্মী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ রাস্তাটি খুবই বিপদজনক হয়ে উঠেছে। ৬ কিলোমিটার রাস্তায় কোনো সড়কবাতি নেই। সন্ধ্যার পর পোশাককর্মীদের এই রাস্তায় চলাচল করতে ভয় লাগে।’বাংলাবাজার এলাকার রাসেল জানান, কলকারখানায় কর্মরতরা কাজ শেষে অটোতে চলাচল করতেও ভয় পান। কারণ প্রায়ই অটো থামিয়ে ছিনতাই করে সবকিছু নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এমন ঘটনা ঘটে।গত কয়েক মাস ধরেই এসব ছিনতাই ও ডাকাতি চলছে। মহাসড়কে সড়কবাতি না থাকা এবং পাশে গহিন জঙ্গল থাকার কারণে অপরাধী চক্র সহজেই সক্রিয় হয়ে উঠছে। এ ছাড়া মহাসড়কে টহল পুলিশের উপস্থিতিও কম।এ বিষয়ে কাউলতিয়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. সুমন খান জানান, প্রতিদিন রাতেই বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। চারটি টিমে মোট ১৭ জন সদস্য কাজ করছেন। তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে মহাসড়কের দুই পাশে ঘন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করিয়েছেন, যাতে ছিনতাইকারীরা সেখানে অবস্থান নিতে না পারে।গাজীপুর সদর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মেহেদী হাসান জানান, এসব ঘটনায় এ পর্যন্ত সদর থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। শনিবার অভিযানে আমির হোসেন নামে এক ডাকাত সর্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ডাকাতি ও ছিনতাইসহ ছয়টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় আরও ৮-১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।জিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘জায়গাটি গাজীপুর সদর থানা থেকে বেশ দূরে বিস্তীর্ণ এলাকা। সেখানে অন্ধকারাচ্ছন্নতা ও গাছপালার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা ছিনতাই করেছে। এ বিষয়ে মামলা হয়েছে। হয়তো আরও ঘটনা ঘটেছে, সবাই তো আর মামলা করতে থানায় যায় না। এমন ঘটনা জানতে পারলে আমরা তৎপর হই। নিয়মিত টহল দেওয়া হচ্ছে এবং একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। ক্যাম্পের সদস্যরাও মোটরসাইকেল নিয়ে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন।’তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চক্রের তৎপরতা কমেনি। প্রায় প্রতিরাতেই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটছে এবং সর্বস্ব হারাচ্ছেন চালক ও যাত্রীরা।গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক জানান, ছিনতাই ও ডাকাতির বিষয়গুলো তাদের নজরে এসেছে। প্রধান রাস্তাটি সড়ক বিভাগের অধীনে হলেও জনভোগান্তি লাঘবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের প্রতিটি জায়গায় সড়কবাতি স্থাপনের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার মূল্যায়ন চলমান। এটি সম্পন্ন হলে কাজ শুরু হবে। এসব বাতি স্থাপন হলে অপরাধ কমে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।যাত্রী ও চালকদের জানমালের নিরাপত্তায় পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছেন এই মহাসড়কে চলাচলকারী মানুষ ও স্থানীয়রা।
Discussion
Please Sign In to join the discussion.