Bangla
হেমন্তের শুরুতেই দূষণে ধূসর ঢাকা
। শীত শুরুর আগেই বিষাক্ত হয়ে পড়ছে নগরীর বাতাস। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ধুলো নাগরিক জীবনকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে। সাধারণত কুয়াশা আর শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে শীতকালে ঢাকার বাতাস মারাত্মক দূষিত হয়ে উঠলেও এবার শরৎ ও হেমন্তের সন্ধিক্ষণেই বাতাসের মান জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউ এয়ারের সূচকে গত দুই মাসে একাধিকবার সর্বোচ্চ দূষিত শহরের তালিকায় উঠে এসেছে ঢাকা। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ কারণে দূষণের শীর্ষে থাকছে ঢাকা। এর মধ্যে নির্মাণকাজ, ইটভাটা ও শিল্পকারখানা, ধূলিঝড় এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত কালো ধোঁয়া, বর্জ্য পোড়ানো ও ট্রান্স-বাউন্ডারি এয়ার পলিউশন। তাদের ভাষ্য, পরিবেশ অধিদফতর একের পর এক প্রকল্প নিয়েও দূষণের এসব উৎস বন্ধ করতে পারেনি। যার ফলে প্রতি বছর অক্টোবর মাস থেকে ঢাকার বায়ুর মান দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। এবারো এর ব্যতিক্রম হয়নি। দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতায় চার কারণ চিহ্নিত করে তারা জানান, প্রকল্প-নির্ভরতা ও স্থায়ী সমাধানের অভাব, প্রধান উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি দুর্বলতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণেই তা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।তবে পরিবেশ অধিদফতর এবং সিটি করপোরেশন বলছে, ঢাকার বায়ু, শব্দ এবং বর্জ্য দূষণ রোধে তারা সমন্বিতভাবে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য বন্ধে অভিযান, বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলাধার ও লেক সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন অপসারণ। যদি বাস্তবে তার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় গড়ে বায়ুদূষণ বেড়েছে ৯.৮ শতাংশ। বিগত কয়েক বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকার মানুষ একদিনও ভালো বা নির্মল বায়ু পায়নি। এর মধ্যে দূষণে শীর্ষে এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে, বারিধারা পার্ক রোড, বিআইডিএস ও গুলশান লেক পার্ক, বেচারাম দেউড়ি, সাগুফতা ও গুলশানের বে’জ এইজ ওয়াটার, দক্ষিণ পল্লবী, তেজগাঁও, আহসান মঞ্জিল, আবদুল্লাহপুর, মতিঝিল, ধানমন্ডি-৩২, সংসদ ভবন, আগারগাঁও, মিরপুর-১০। এ বিষয়ে স্ট্যামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার জানান, গবেষণায় তারা ঢাকার বায়ুদূষণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রমাণ পেয়েছেন। দূষণ বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিতে তিনি বলেন, বর্ষার বিদায়ের পরপরই মেগাসিটির চারপাশে ইটভাটাগুলো সচল হওয়া, অপরিকল্পিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ধূলিঝড় এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত কালো ধোঁয়ার কারণে বাতাসে ক্ষতিকারক পিএম কণার উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এতে করে শীতের আগেই দূষণ ভয়ানক আকার ধারণ করছে, যা ডিসেম্বর জানুয়ারির দিকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এ বিষয়ে শ্যামলীর ২৫০ শয্যা টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার নয়া দিগন্তকে বলেন, বায়ুদূষণে ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসে প্রদাহ, নিউমোনিয়াসহ ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ে। এছাড়া গর্ভপাত, জন্মত্রুটি, শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশেও বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বায়ুদূষণ। তিনি বলেন, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এই তিন মাসে দুষণ বাড়ার কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অন্য সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি থাকে। এ দূষণের ফলে যারা হাঁপানি ও ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সচেতনতার সাথে মানুষকে নাক-মুখ ঢেকে বা মাস্ক পরে বাইরে যাওয়া উচিত। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক মো: জিয়াউল হক বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা রাস্তার ধুলা। একইভাবে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে শহরের বিভিন্ন জায়গায়। এটা নিয়ন্ত্রণ করবে কে? কারণ আইন থাকলেও তার প্রয়োগটা দুর্বল। তাই এখন জনগণ বা সরকারি-বেসরকারি যেসব পর্যায়ে যারা দূষণ করছে তাদের দূষণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করতে হবে। এ ছাড়া আগেই ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি অ্যাকশন প্ল্যান করা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং। এজন্য আইন কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্য দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা নিজেদের অসহায়ত্ব শিকার করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে এ পর্যন্ত যতগুলো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা শতভাগ কার্যকর সম্ভব হয়নি। কারণ নানা বিপত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শতভাগ আইন প্রয়োগ সম্ভব হয় না। তারপরও আমরা বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিন পানি ছিটাচ্ছি। অনেক সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি। বায়ুদূষণের যে সোর্স রয়েছে, সেখানে আমরা সব সময় মনিটর করে এনফোর্স করি। নির্মাণাধীন স্থান ঢেকে রাখতে বলি। কিন্তু কেউ কথা শুনছে না। অন্য দিক লোকবল সঙ্কটে বিরাট এলাকা কাভারেজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
Discussion
Please Sign In to join the discussion.