Bangla
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারে রাজনৈতিক অঙ্গীকার
(দ্বিতীয় পর্ব)ন্যায়পাল : বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘১. সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠায় বিধান করিতে পারিবেন। ২. সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোনো মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করিবেন। ৩. ন্যায়পাল তাহার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রণয়ন করিবেন এবং অনুরূপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হইবে।’ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের সুপারিশের ভিত্তিতে ন্যায়পাল পদে কাউকে নিয়োগ দেবেন।মওদুদ আহমদ (১৯৮৭) মনে করেন, ‘সংসদীয় প্রাধান্য অব্যাহত রেখে এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্রের যেকোনো কার্যপদ্ধতি পর্যালোচনা করার জন্য সংসদীয় আইন দ্বারা ন্যায়পালের পদ সৃষ্টির বিধান করা হয়েছিল। যদিও এ উপমহাদেশের কোনো দেশের সংবিধানে এ ধরনের ন্যায়পালের অস্তিত্ব নেই এবং পৃথিবীর খুব কমসংখ্যক দেশে এর অবস্থিতি পরিদৃষ্ট হয়, তথাপি ব্যতিক্রমধর্মী এই পদ সৃষ্টির উদ্যোগে দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠনসমূহ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় আওয়ামী লীগের সদিচ্ছাই প্রতিফলিত করেছিল।’ উল্লেখ করা যেতে পারে, সুইডেন ১৮০৯, নিউজিল্যান্ড ১৯৬২, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১৩ সালে ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি করে।মজার বিষয় হলো— শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে দেশের সংবিধান প্রণয়ন ও গণপরিষদে তার অনুমোদন হলেও সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ কার্যকর করার জন্য তার শাসনামলে কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এতে ন্যায়পালের পদ সৃষ্টির বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে আওয়ামী লীগ সরকার যে ‘সদিচ্ছার’ পরিচয় দিয়েছিল তার বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের আন্তরিকতার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। অবশ্য যে দলটি গণতন্ত্রকে পদদলিত করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল, তার কাছে ন্যায়পালের পদ সৃষ্টির আশা করা বাতুলতা মাত্র। শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সাল ও পরবর্তীতে বারবার ক্ষমতায় এসে কখনো ন্যায়পাল নিয়োগের আইন বাস্তবায়নের কথা একবারও উচ্চারণ করেননি। তবে তার নেতৃত্বে সংবিধানের বহু ব্যবচ্ছেদ হলেও ন্যায়পালের পদ বাতিলের কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। সেটিই বা কম কিসে?লক্ষণীয় যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন সেনানায়ক হওয়া সত্ত্বেও বাকশাল বাতিল করে একদিকে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন; অপরদিকে, ১৯৮০ সালে সংসদে ন্যায়পাল আইন পাস করা হয়। তবে সেটি তখন সরকারি প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়নি। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের ৬ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপন জারি করে আইনটি কার্যকর করা হয়। তবে অজ্ঞাত কারণে চারদলীয় জোট সরকারের আমলেও ন্যায়পাল নিয়োগ করা হয়নি।অধিকাংশ দেশে ন্যায়পালের পদ না থাকলেও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এরূপ একটি সাংবিধানিক পদের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো যেসব দেশে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ দুর্বল এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, সেখানে এরূপ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো— যদি পদটির প্রয়োজনীয়তা থাকে এবং সেটি জবাবদিহির স্বার্থে প্রয়োজন, তা হলে অতীতের সরকারগুলো বিগত ৫৪ বছরে তা বাস্তবায়নে কেন আগ্রহ দেখায়নি? এটি একটি জটিল প্রশ্ন। যারা অতীতে সরকারে ছিলেন তাদের কারো মুখ থেকে এ বিষয়ে এ পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাহলে বিষয়টি কি রহস্যজনক মনে হচ্ছে না?সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে ‘সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন’— বলে যে ভাষ্য আছে, তাতে আইন প্রণয়নের কাজটি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তবে ১৯৮০ সালের সংশ্লিষ্ট আইনটিতে ন্যায়পাল নিয়োগকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও ২০০২ সালে আইনটির কার্যকারিতা দেয়া হলেও জোট সরকার তা পরবর্তী তিন বছরেও বাস্তবায়ন করেনি। এরপর ২০২৪ সাল পর্যন্ত তো দেশের শাসনব্যবস্থা এমন ছিল যে, জনগণকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করতে হয়েছে; ন্যায়পালের পদ নিয়ে ভাবনার অবকাশ তখন কারোর ছিল না।চব্বিশের বিপ্লবের পরে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারে প্রত্যাশার যে ঢেউ সৃষ্টি হয় তার পরিপ্রেক্ষিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মেলবন্ধনের উদ্যোগ নেয়। ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন সংস্কারের মধ্যে ন্যায়পাল পদটি নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগের জন্য প্রস্তাব করে। এতে বলা হয় যে— ‘ক. সংবিধানের বর্তমান অনুচ্ছেদ ৭৭ সংশোধনপূর্বক ৭৭ (ক)-তে যুক্ত করা হবে যে, এই সংবিধানের অধীনে দেশে একজন ন্যায়পাল থাকিবেন।’খ. সংবিধানের বিধানাবলিসাপেক্ষে— ১. জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এই বাছাই কমিটির প্রধান হবেন); ২. ডেপুটি স্পিকার (যিনি বিরোধী দল হইতে নির্বাচিত হবেন); ৩. সংসদ নেতা; ৪. বিরোধী দলের নেতা; ৫. দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি; ৬. রাষ্ট্রপতির একজন প্রতিনিধি (নির্দলীয় ব্যক্তি এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন) এবং ৭. প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসেবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হবে। এ কমিটি ন্যায়পাল পদে নিয়োগ লাভের উপযুক্ত (সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের দ্বারা যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারিত হবে) এবং এ পদে নিয়োগ লাভে আগ্রহী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আইন দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ অথবা তথ্য আহ্বান করাসহ উপযুক্ত প্রার্থীর অনুসন্ধানকার্যক্রম পরিচালনা করবে।গ. অনুসন্ধানে প্রাপ্ত জীবনবৃত্তান্তসমূহ যাচাই-বাছাই করত উক্ত বাছাই কমিটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাছাইকৃতদের মধ্য থেকে একজনকে ন্যায়পাল পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করবে; অতঃপর রাষ্ট্রপতি তাকে কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দান করবেন।’জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উল্লিখিত প্রস্তাবের প্রতি জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ মোট ২৫টি রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করে। অপরদিকে, বিএনপিসহ (১২ দলীয় জোট, আমজনতার দল, এনডিএম ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এলডিপি) সাতটি দল ভিন্নমত পোষণ করে আইনি প্রক্রিয়ায় ন্যায়পাল নিয়োগের পক্ষে মত দেয়। উল্লেখ্য যে, কোনো দল ন্যায়পাল নিয়োগের বিপক্ষে মত দেয়নি; শুধু নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে ভিন্নমত দিয়েছে। এক্ষেত্রে ঐকমত্য কমিশন এক নোটে বলেছে, ‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেøখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে সেমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’ অপরদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এর পঞ্চম অনুচ্ছেদে গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনীয় প্রশ্ন সম্পর্কে বলা হয়, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১-এ বর্ণিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ স্মরণযোগ্য, তফসিল-১-এ অন্যান্যের মধ্যে ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত আছে। তবে গণভোটে প্রশ্নটি একটু ভিন্নভাবে পেশ করা হয় যা ছিল নিম্নরূপ : ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ : (ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।’ বলা নিষ্প্রয়োজন, এতে অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কথা বলার মধ্যে ন্যায়পাল পদটিও আছে।এবারে দেখা যাক, ক্ষমতাসীন বিএনপি নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ইশতেহারে কী বলেছিল? তাদের ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ১ ক্রমিকে বলা হয়েছে— ‘সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ জুলাই জাতীয় সনদে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সেমতে বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।’ এছাড়া ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার অংশের ৩১ ক্রমিকে মাত্র চারটি শব্দ বলা হয়েছে : ‘ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে’। লক্ষণীয় যে, বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরাসরি অঙ্গীকার না করে ভাষার কৌশল খাটিয়ে বস্তুত বিষয়টি গৌণ করে দিয়েছে। তবে একদিকে গণভোটে জনগণ অন্যান্যের মধ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি জুলাই সনদের আলোকে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং অপরদিকে, বিএনপি তাদের ইশতেহারেও ন্যায়পাল নিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। সুতরাং যেকোনো পদ্ধতিতে হোক না কেন, ন্যায়পাল নিয়োগের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। সরকার এ ব্যাপারে কী করে তা দেখতে হয়তো আরো চার বছর অপেক্ষা করা লাগতে পারে।এদিকে, ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়ে সংবিধানের ভাষ্য এবং ১৯৮০ সালের ন্যায়পাল আইন সরকারকে ন্যায়পাল নিয়োগ বাধ্যতামূলক করলেও কোনো সরকার উদ্যোগ গ্রহণ না করার বিরুদ্ধে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান কর্তৃক এক রিট পিটিশন দাখিলের পরিপ্রেক্ষিতে ২১ মে ২০২৬ হাইকোর্ট এক রুল জারি করেন। রুলে সরকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সংবিধাননের ৭৭ অনুচ্ছেদ ও ১৯৮০ সালে আইন থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার কেন ন্যায়পাল পদে নিয়োগ দিচ্ছে না।
Discussion
Please Sign In to join the discussion.